শিল্পমন্ত্রীর মিথ্যাচার!

দৈনিক এই আমার দেশ দৈনিক এই আমার দেশ

নিজস্ব প্রতিবেদক : আমাদের বর্তমান শিল্পমন্ত্রী নুরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ূন। তিনি পেশায় একজন বড় ব্যবসায়ী কাম সিনিয়র এডভোকেট কাম রাজনীতিবিদ। ছাত্র রাজনীতি থেকে উঠে আসা এই পোড় খাওয়া রাজনীতিক তাঁর আইন পেশার সিনিয়র কর্তৃক প্রভাবিত হওয়ার কথা। তাই মন্ত্রী মহোদয়ের কথায় এখন অন্য সুর দেখছি। মনে হচ্ছে তিনি আমাদের দেশের অন্যতম সিনিয়র এডভোকেট ড. কামাল হোসেন দ্বারা বিশেষভাবেই প্রভাবিত। পুরান ঢাকার চকবাজারে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় রাসায়নিক গুদামে অগ্নিকাণ্ড নিয়ে তিনি যে মন্তব্য করেছেন, তাতে আমরা শুধু হতবাক হইনি, একটা পতনোন্মুখ আগ্রাসী বার্তা পাচ্ছি উনার কথা আর কাজে। তাঁর সাথে ড. কামাল হোসেনের চিন্তার এত মিল যে, এমন মিল সচারচর খুঁজে পাওয়া যায় না।

মন্ত্রী মহোদয় তাঁর বিশ্বাস থেকে না মন্ত্রণালয় থেকে দেয়া রিপোর্টের ভিত্তিতে কথা বলছেন তা জানা যায়নি। তবে যার বলা বা লেখা কথাই উনি বলুন না কেন এখন এটা উনার কথা। উনি বলেছেন, পুরান ঢাকার চকবাজারে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় রাসায়নিক গুদামে অগ্নিকাণ্ডের সাথে চুড়িহাট্টার হাজী ওয়াহেদ ম্যানশন এর কোনো সম্পর্ক নেই, ওই ভবনে কোনো রাসায়নিক গুদামও নেই বলে মন্তব্য করেছেন শিল্পমন্ত্রী। তিনি বলেছেন, সেখানে কেমিক্যালের কোনো গোডাউন নেই, পারফিউম ও কসমেটিক সামগ্রীর গোডাউন আছে। আমি নিজে এটা দেখলাম। কেমিক্যালের সঙ্গে এই ঘটনার সম্পর্ক নেই। তাঁর দাবি, এলপি গ্যাসের সিলিন্ডার বিস্ফোরণ থেকে অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে। চমৎকার বলেছেন তিনি। আহা কী চমৎকার বলা! যেমনটি বলেছেন আমাদের সিনিয়র এডভোকেট ড. কামাল হোসেন। ঐক্যফ্রন্টের ধানের শীষ প্রতীকে জামায়াতের লোক নির্বাচন করেছেন তা তিনি জানতেন না। অসাধারণ মিল দুই সিনিয়র এডভোকেটের চিন্তায়, চেতনায় আর কথার কৌশলে।

আগুনে পুড়ে যাওয়া ভবনে কোনো রাসায়নিক গুদাম নেই বলে জানিয়ে শিল্পমন্ত্রী নুরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ূন জানান। কিন্তু দেশ-বিদেশের মিডিয়ায় সচিত্র প্রতিবেদন বলছে, পুরান ঢাকার চকবাজারের চুড়িহাট্টার হাজী ওয়াহেদ ম্যানশন ধ্বংসাবশেষে পরিণত হলেও ভবনের বেজমেন্টটি এখনও অক্ষত, আর সেখানে অন্তত ২০ কোটি টাকার কেমিক্যাল মজুদ আছে। মিডিয়া বলছে, শিল্পমন্ত্রী সত্য গোপন করেছেন বা মিথ্যাচার করেছেন।

শিল্পমন্ত্রী আরো বলেছেন যে, সেখানে কেমিক্যালের কোনো গোডাউন নেই, পারফিউম ও কসমেটিক সামগ্রীর গোডাউন আছে। আমি নিজে এটা দেখলাম। তাহলে কী দাঁড়ালো! উনার মানুষ উনাকে বিভ্রান্ত করেছেন বা মন্ত্রী মহোদয়ের চোখের সমস্যা হয়েছে। তবে তাঁর বুদ্ধি বা আক্কেল জ্ঞানের যে সমস্যা হয়েছে তা বুঝ যায়। কারণ পারফিউম শুধু কেমিক্যালই না, এটি একটা টক্সিক কেমিক্যাল, যা আরও বেশি ক্ষতিকর হতে পারে বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে।

শিল্পমন্ত্রী খুব দম্ভ ভরে বলেছেন, পুরান ঢাকার কেমিক্যাল ব্যবসা বংশ পরম্পরায়। এটাতো বন্ধ করা যাবে না। এর সঙ্গে অনেক কিছু জড়িত। আমি পুরান ঢাকার মানুষ। আমি জানি। ২১ ফেব্রুয়ারি দুপুরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের (ঢামেক) বার্ন ইউনিট পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী রাগত স্বরে বলেন, আপনারা কি ভিনগ্রহ থেকে এসেছেন নাকি? আমরা কি ঢাকা শহর গুঁড়িয়ে দেবো? তিনি বলেন,;তারা (ব্যবসায়ীরা) যেতে চায় না। আমাদের বাস্তবতা বুঝতে হবে। অর্থনৈতিক প্রবাহ বন্ধ করা যাবে না

২০ ফেব্রুয়ারি রাতে চকবাজারের নন্দকুমার দত্ত রোডের শেষ মাথায় চুড়িহাট্টা শাহী মসজিদের পাশে ৬৪ নম্বর হোল্ডিংয়ের ওয়াহিদ ম্যানশনে অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত হয়। আবাসিক ভবনটিতে কেমিক্যাল গোডাউন থাকায় আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে প্রায় ৭০ জন পুড়ে মারা যায় ও আহত হয়েছেন ৪১ জন। ফায়ার সার্ভিসের তিন’শ কর্মীর সমন্বয়ে ১৩টি স্টেশনের ৩৭টি ইউনিট আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে।

শিল্পমন্ত্রী মহোদয় প্রধানমন্ত্রী বক্তব্যের ঠিক উল্টা কথা বললেন। কেন বললেন তা বোঝা যাচ্ছে না। তবে তাঁর কথায় একজন আমলা রাজনীতিবিদ বা ব্যবসায়ী রাজনীতিবিদের কথার প্রতিধ্বনি শুনতে পাই আমরা। আপনারা মনে করতে পারেন যে, বিএনপি’র খালেদা জিয়ার শাসনামলে ২০০১-২০০৬ সালে বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আলতাফ হোসেন চৌধুরী সন্ত্রাসীদের গুলিতে এক শিশুর মৃত্যুকে নিয়ে বলেছিলেন, আল্লাহর মাল আল্লাহ নিয়েছছে। উনার কথায় তৎকালীন সরকারকে যারপরনাই বিব্রত হতে হয়, যার রেশ এখনো কাটেনি। ২০১৩ সালে সাভারে রানা প্লাজা ধ্বংসের সময় আমলা রাজনীতিবিদ ও তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহিউদ্দিন খান আলমগীর পুলিশের রিপোর্টের ভিত্তিতে ঝাঁকি তত্ত্ব আবিস্কার করে বলেন, মৌলবাদী বিএনপি’র হরতাল সমর্থকরা ফাটল ধরা ভবনটি নাড়াচাড়া করায় সাভারের রানা প্লাজা ধসে পড়তে পারে। বিবিসি বাংলাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এমন আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন। সেই ঝাঁকি তত্ত্বের রেশ এখনো কাটেনি, সময় নেবে আরও অনেকদিন।

ড. মুহাম্মদ ইউনূস এবং তার প্রতিষ্ঠিত গ্রামীণ ব্যাংক যৌথভাবে ২০০৬ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কার লাভ করেন। প্রতিষ্ঠিত গ্রামীণ ব্যাংকের সহযোগী প্রতিষ্ঠান গ্রামীণ টেলিকম বাংলাদেশে গ্রামীণ ফোনের অন্যতম অংশীদার। অবৈধ ভিওআইপির মাধ্যমে রাজস্ব ফাঁকি দেওয়ায় দেশের বৃহত্তম টেলিকম কোস্পানি গ্রামীণ ফোনকে কিছুদিন আগে ২৫০ কোটি টাকা জরিমানা করে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)। গ্রামীণফোন জরিমানার টাকা সরকারি কোষাগারে জমা হয়। এর আগে ২০০৭ সালে একই কারণে ১৬৮ কোটি ৪০ লাখ জরিমানা হয়। ১৯৯৬ সালের ২৮ নভেম্বর লাইসেন্স পায় গ্রামীণ কনসোর্টিয়াম। চুরির দায়ে দণ্ডিত প্রতিষ্ঠান কী করে নোবেল পায় এমন প্রশ্নের জবাবে ড. ইউনুস বলেন যে, গ্রামীণ টেলিকম গ্রামীণ ব্যাংকের সহযোগী প্রতিষ্ঠান, তাই এতে দোষের কিছু নেই। তাঁকে পালটা জানানো হয়- ‘তাঁর মানে এই যে, আমার হাতে খুন হলে জেল ফাঁসি যাই হউক না কেন তা হবে আমার হাতের, আমার না’! ড. মুহাম্মদ ইউনূসের মুখে এমন কথা এসেছে কারণ তিনি আপাদমস্তক বেনিয়া বলে, উনার কাছে টাকাই ভগবান। সেটা চুরি করা বা যেভাবেই আয় করা হউক না কেন। মানবিক গুণাবলী সম্পন্ন মানুষ হলে কথাটা একটু সুন্দর করে বলতে পারতেন উনি।

আমাদের বর্তমান শিল্পমন্ত্রী নুরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ূন শুধুই ব্যবসায়ী, উনি জনপ্রতিনিধি নন তা তাঁর কথায় প্রমাণ পাওয়া যায়। এতগুলো প্রাণের বিনিময়ে উনারা দলবল মিলে কেমিক্যাল ব্যবসার নামে টাকার পাহাড় বানাতে চান। তাই তিনি প্রধানমন্ত্রী কথার উল্টা সুরে গান গাইতে শুরু করেছেন, এতো বেপরোয়া তিনি হন কীভাবে তা আমাদের বোধগম্য নয়। মন্ত্রী যে অশোভন, অমানবিক কথা বলেছেন চকবাজারের হত্যাকাণ্ডে মানুষের মৃত্যু নিয়ে, তা জন্ম জন্মান্তরেও তাঁর পিছু ছাড়বে বলে মনে হয় না। এই কথার মধ্য দিয়ে তিনি বুঝিয়ে দিয়েছেন যে, এক পরম মানবিক প্রধানমন্ত্রীর মন্ত্রিসভায় তিনি একজন নিরেট ব্যবসায়ী, শুধুই ব্যবসায়ী; রাজনীতিবিদ হতে পারেননি আজও। অন্যভাবে তাহলে কী সবাই ধরে নেবেন যে, ব্যবসায়ীরা রাজনীতি করেন শুধুমাত্র ব্যবসার জন্য, মানুষের কল্যাণে নয়! টাকার জন্য মানুষের জীবন এধরণের মানসিকতার মন্ত্রীর কাছে তুচ্ছ ব্যাপার, অথবা উনার মাথায় কোন গোলমাল আছে। তা না হলে এমন জনবিরোধী কথা কেন তাঁর!