দেশ জুড়ে নিন্দা প্রতিবাদের ঝড়


পুরান ঢাকায় বিশ্বজিতের পর এবার বরগুনাতে দিনদুপুরে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা করা হলো রিফাত শরীফকে (২৬)। মোবাইল ফোনে ভিডিও ফুটেজ আর ছবিতে এ হত্যাকাণ্ড দেখেছেন বহু মানুষ। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিন্দা ও প্রতিবাদের ঝড় বইছে দেশ জুড়ে। অনেক জায়গায় সড়কে নেমে প্রতিবাদ জানিয়েছেন অনেকে। ফিল্মি স্টাইলে পাঁচ থেকে ছয় মিনিটের ছিল ঘাতকদের অপারেশন। রিফাতের স্ত্রী আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নি খুনিদের নানাভাবে থামানোর চেষ্টা করেছেন। কিন্তু খুনিদের রামদা কোনোভাবেই থামাতে পারেননি তিনি।

বুধবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে স্ত্রী আয়েশাকে বরগুনা সরকারি কলেজে নিয়ে যান রিফাত। কলেজ থেকে ফেরার পথে মূল ফটকের সামনে নয়ন ও রিফাত ফারাজীসহ কয়েকজন রিফাত শরীফের ওপর হামলা চালায়। এ সময় ধারালো অস্ত্র দিয়ে রিফাত শরীফকে এলোপাতাড়ি কোপাতে থাকে তারা। রিফাত শরীফের স্ত্রী আয়েশা তাদের নিবৃত্ত করার চেষ্টা করেন। কিন্তু কিছুতেই তাদের থামানো যায়নি। তারা রিফাত শরীফকে উপর্যুপরি কুপিয়ে রক্তাক্ত করে চলে যায়। পরে স্থানীয় লোকজন রিফাত শরীফকে উদ্ধার করে বরগুনা জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যান। পরে শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে রিফাতের মৃত্যু হয়।

পাঁচ থেকে ছয় মিনিটের অপারেশন

কলেজ থেকে স্ত্রী মিন্নিকে নিতে যান স্বামী রিফাত শরীফ। আগে থেকে সেখানে ওঁত্ পেতে থাকা কয়েকজন যুবক রিফাতকে টেনে-হিঁচড়ে বের করে পেটাতে থাকে। এর পরপরই সাব্বির হোসেন নয়ন ওরফে নয়ন বন্ডের নেতৃত্বে কয়েকজন ধারালো অস্ত্র নিয়ে হামলে পড়ে রিফাতের ওপর। তারা উপর্যুপরি কোপাতে থাকে তাকে। হতবিহ্বল মিন্নি দৌড়াদৌড়ি করে, চিত্কার করে আশেপাশের লোকজনের সাহায্য চান। কিন্তু এক যুবক ছাড়া আর কেউ এগিয়ে না আসায় নিজেই ছুটে যান স্বামীকে বাঁচাতে।

সন্ত্রাসীদের ধাক্কা দিয়ে, পেছন থেকে আঁকড়ে ধরেন, তাদের হাত ধরে আটকানোর চেষ্টা করেন মিন্নি। কিন্তু তাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিয়ে রিফাতকে রামদা দিয়ে কোপাতে থাকে সন্ত্রাসীরা। এর মধ্যে হাতে থাকা লাল রঙের একটা ব্যাগ দিয়ে সন্ত্রাসীদের রামদার কোপ আটকানোর চেষ্টা করছিলেন রিফাত। তারই একটিতে সন্ত্রাসী রিফাত ফারাজীর রামদা হাতল থেকে খুলে মাটিতে পড়ে যায়। তখন সেই হাতলটাই রিফাত শরীফের গায়ে ঢিল মারে রিফাত ফারাজী। এরপর হাতে অস্ত্র না থাকায় ধরা পড়ার ভয়ে সে পেছাতে থাকে। তাকে দেখে রামদা উঁচিয়ে ঘটনাস্থল ত্যাগ করে নয়ন বন্ডসহ অন্য খুনিরা। মাত্র পাঁচ থেকে ছয় মিনিটের মধ্যে ঘটে এ লোমহর্ষক ঘটনা।

রিফাতের শরীরে ৮টি কোপের চিহ্ন

বহু মানুষের উপস্থিতিতে স্ত্রীর সামনে নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার স্বামী রিফাত শরীফের শরীরে আটটি কোপের চিহ্ন পেয়েছেন চিকিত্সকরা। একই সঙ্গে ঘাড়ের রগ ও শরীরে বড়ো বড়ো ক্ষতের সৃষ্টি হয়ে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে তার মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছেন চিকিত্সকরা। গতকাল বৃহস্পতিবার বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মর্গে রিফাত শরীফের মরদেহের ময়নাতদন্ত শেষে এসব কথা জানান চিকিত্সকরা। বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের সার্জারি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. জামিল হোসেনের নেতৃত্বে ফরেনসিক বিভাগের প্রভাষক ডা. মাইদুল হোসেন ও ফরেনসিক বিভাগের প্রভাষক ডা. তন্নী ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করেন।

ডা. জামিল হোসেন বলেন, রিফাত শরীফের শরীরে মারাত্মক আঘাত করা হয়েছে। তার গলা, মাথা ও বুকের ওপর তিনটি বড়ো ক্ষত রয়েছে। তার গলার রগ কেটে গেছে। গলার রগ কেটে প্রচুর রক্তক্ষরণে মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া ভারী অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে তার শরীরের বিভিন্ন স্থানে ক্ষত করা হয়েছে। তার ডান হাত এবং বাম হাতে দুটি বড়ো ক্ষত রয়েছে। রিফাতের শরীরে সাত-আটটি বড়ো আঘাতের চিহ্ন রয়েছে যেসব আঘাতে বড়ো ক্ষতের সৃষ্টি হয়েছে। এসব ক্ষত থেকে প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়ে রিফাত মারা যান।

‘দাঁড়ানো ছেলেগুলো দর্শক নয়, তারাই প্রথমে হামলা করে’

রিফাত শরীফকে কোপানোর সময় যারা চারপাশে দাঁড়িয়ে ছিল, তারাই রিফাতকে প্রথমে আক্রমণ ও মারধর করে বলে জানিয়েছেন রিফাতের স্ত্রী আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নি। তিনি ক্ষোভের সঙ্গে জানান, বারবার সাহায্য চাওয়ার পরও দূরে দাঁড়িয়ে যারা দেখছিল, তাদের কেউ রিফাতকে বাঁচাতে বা হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার জন্য এগিয়ে আসেনি।

ভিডিও ফুটেজে অনেক মানুষ দেখা গেছে, তারা কী করেছে জিজ্ঞেস করলে মিন্নি বলেন, ‘কিছু মানুষ দাঁড়িয়ে দেখেছে। আর কিছু ছেলে ছিল, যারা প্রথমে রিফাতকে আক্রমণ করে। পরে রাম দা নিয়ে দুই-তিন জন কোপায়। যে ছেলেগুলো দাঁড়ানো ছিল তারা দর্শক নয়, প্রথমে তারাই হামলা করে। আর আশপাশে সবাই দেখছে, কেউ আগাইয়া আসে নাই। কেউ কোনো রকম সহায়তা করে নাই। আমি বারবার তাদের বলছি, আমার স্বামীকে বাঁচাও, ছাইড়া দাও ওরে। কিন্তু কেউ আগায় আসে নাই। আমি একলাই তারে হাসপাতালে নিয়া গেছি।’

পরিকল্পিতভাবে হত্যা, সুষ্ঠু বিচার চাই- রিফাতের বাবা

‘আমার ছেলেকে পূর্ব পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। ছেলেকে তো আর ফিরে পাবো না, প্রশাসনের কাছে অনুরোধ, যাতে করে হত্যাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হয়। আমার কিছু চাওয়ার নাই, আমি সুষ্ঠু বিচার চাই’- ছেলের খুনিদের এভাবেই শাস্তির দাবি জানান বরগুনা সদর উপজেলার বুড়িরচর ইউনিয়নের বাসিন্দা নিহত রিফাত শরীফের বাবা দুলাল শরীফ।

দুলাল শরীফ বলেন, ‘সকালে আমি একটু দেরি করে ঘুম থেকে উঠি। সকাল ৯টায় আমার ফোনে তিনবার রিং বাজলেও আমি টের পাই নাই। সকাল ১০টার পরে আমি ঘুম থেকে উঠছি। রিফাতের চাচা শ্বশুরের ফোন পেয়ে হতবিহ্বল হয়ে যাই। তড়িঘড়ি করে একটা মোটরসাইকেল নিয়ে হাসপাতালে গেলাম। সেখানে গিয়ে দেখি অ্যাম্বুলেন্স তাকে (রিফাত) নিয়ে বরিশালের উদ্দেশে রওনা হচ্ছে। আমি দরজা খোলার পর বাবার চেহারাটা দেখার পর মনে করছি আল্লাহ জানি কী…।’ এ সময় কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি।

মিন্নির বাবাকে মর্গ থেকে বের করে দিল রিফাতের বন্ধুরা

জামাইয়ের মরদেহ আনতে মর্গে গিয়ে তোপের মুখে পড়েছেন নিহত রিফাতের শ্বশুর মোজ্জাম্মেল হোসেন। এ সময় মোজ্জাম্মেল হোসেনকে হাসপাতালের মর্গ থেকে বের করে দেন রিফাতের বন্ধুরা।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বেলা সাড়ে ১১টার দিকে হাসপাতালের মর্গের সামনে আসেন রিফাতের শ্বশুর মোজ্জাম্মেল হোসেন। এ সময় স্থানীয় সাংবাদিকরা তাকে ঘিরে ধরেন। কয়েকজন সাংবাদিক তার কাছে জামাই রিফাত হত্যার কারণ জানতে চান। তখন তিনি স্থানীয় সাংবাদিকদের জানান, এটি নারীঘটিত ঘটনা হলেও আমার মেয়ের সঙ্গে খুনিদের কোনো পরিচয় ছিল না। আমার মেয়েকে খুনিরা উত্ত্যক্ত করতো। জামাই এ ঘটনার প্রতিবাদ করেছিল বলেই তাকে খুন করা হয়েছে। এ সময় রিফাতের কয়েকজন বন্ধু মোজ্জাম্মেল হোসেনের ওপর চড়াও হন। সেই সঙ্গে মোজ্জাম্মেল হোসেনকে মিথ্যাবাদী উল্লেখ করে সেখান থেকে তাড়িয়ে দেন রিফাতের বন্ধুরা।

রিফাতের ঘনিষ্ঠ বন্ধু মঞ্জুরুল আলম জন, বিল্লাল হোসেন, নাজমুলসহ কয়েজনজন ঘটনাস্থলে জানান, মিন্নির বাবা সাংবাদিকদের মিথ্যা বলছেন। তার মেয়ের সঙ্গে খুনিদের পরিচয় ছিল। বিষয়টি আমরা আগে থেকেই জানতাম। নয়নের সঙ্গে মিন্নির আগে থেকে সম্পর্ক আছে, সেটিও আড়াল করেছেন মিন্নির বাবা। এসব বিষয় তদন্ত করলে সব সত্য বেরিয়ে আসবে। মিন্নির বাবা সবই জানেন এবং মিন্নিও অনেক বিষয় জানেন।

মামলা দায়ের, গ্রেফতার ৩

রিফাত হত্যা ঘটনায় ১২ জনকে আসামি করে গতকাল বরগুনা থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে। এ ঘটনায় চন্দন (২২), হাসান (২৪) ও নাজমুল (২৫) নামের তিন সন্ত্রাসীকে পুলিশ গ্রেফতার করেছে। তবে হত্যাকাণ্ডের প্রধান আসামি নয়ন ও রিফাত ফরাজীসহ অন্যদের এখনো আটক করতে পারেনি পুলিশ।

বরগুনা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবীর মোহাম্মদ হোসেন বলেন, মামলার অন্য আসামিদের গ্রেফতারে জোর অভিযান চলছে। ছয়টি চেক পোস্টে পুলিশের ছয়টি টিম একযোগে কাজ করছে। তিনি বলেন, যেখানেই থাক খুনিদের গ্রেফতার করা হবে।

বরগুনা-১ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভু সাংবাদিকদের বলেছেন, আমার ৫০ বছরের রাজনৈতিক জীবনে বরগুনায় এ রকম নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেনি। এই হত্যার সঙ্গে যারা জড়িত রয়েছে তারা যে দলের বা বংশের সদস্য হোক না কেন তাদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।