চুয়াডাঙ্গায় খামারিদের কোরবানির পশু বিক্রির আশা প্রায় ৮০৩ কোটি টাকা

মফিজ জোয়ার্দ্দার, প্রতিনিধি চুয়াডাঙ্গা : (১০-০৬-২০২৪) আসন্ন ঈদকে সামনে রেখে ব্যস্ত সময় পার করছেন চুয়াডাঙ্গার খামারিরা। এদিকে কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে জেলার বিভিন্ন পশু হাটে বিকিকিনি শুরু হযেছে। জেলায় চাহিদার তুলনায় কোরবানির পশুর অতিরিক্ত জোগান রয়েছে বলে জেলা প্রাণী সম্পদ অফিস নিশ্চিত করেছেন। আর খামারিরা বলছেন কোরবানীতে দাম কিছুটা বাড়বে। এক্ষেত্রে গো-খাদ্যের ২০-৩০ শতাংশ মুল্য বৃদ্ধিএবং সার্বিক লালন-পালন ব্যয় বেড়ে যাওয়াকে কারণ হিসেবে সামনে আনছেন খামারিরা। এছাড়াও এ বছর তীব্র তাপদাহে পশুর জন্য বাড়তি যত্ন নিতে গিয়েও ব্যয় বেড়ে গেছে। আসন্ন কোরবানীতে ভাল বাজার পেলে চুয়াডাঙ্গায় প্রায় ৮০৩ কোটি টাকার পশু বিক্রি হবে।

জেলায় যে পরিমাণ গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়া প্রস্তুত করা হয়, তা স্থানীয় চাহিদা পুরণের পাশাপাশি দেশের বড় একটি চাহিদা পূরণ করে থাকে। এসব পশু স্থানীয় খামারি ও গৃহস্থরা লালন পালন করে প্রস্তুত করেছেন। তবে জেলার চাহিদার তুলনায় কোরবানীর যোগ্য গরু, মহিষ, ছাগল ও ভেড়া উদ্বৃত্ত রয়েছে বলে জানান।

চুয়াডাঙ্গা প্রাণিসম্পদ অফিস সূত্রে জানা যায়, জেলায় খামারীর সংখ্যা ১০ হাজার ৯১৭টি। এর মধ্যে সদর উপজেলায় ২ হাজার ৬৭৬টি, আলমডাঙ্গা উপজেলায় ৩ হাজার ৫৯৯টি, দামুড়হুদা উপজেলায় ১ হাজার ৯২৮টি ও জীবননগর উপজেলায় ২ হাজার ৭১৪টি। চলতি বছর কোরবানীর চাহিদা রয়েছে জেলায় মোট ২লাখ ১১ হাজার ৮০৭টি। এর মধ্যে সদর উপজেলায় ৩১ হাজার ২২০ টি, আলমডাঙ্গা উপজেলায় ৫৯ হাজার ৭৭৯টি, দামুড়হুদা উপজেলায় ৩১ হাজার ৫৫৯টি ও জীবননগর উপজেলায় ৩৬ হাজার ২১৯৮টি। জেলার চাহিদা মিটিয়ে ৫২ হাজার ৯৫১টি পশু উদ্বৃত্ব থাকবে। তার মধ্যে সদর উপজেলায় ১০ হাজার ৪০৭টি, আলমডাঙ্গা উপজেলায় ১৯ হাজার ৯২৬টি, দামুড়হুদা উপজেলায় ১০ হাজার ৫১৯টি ও জীবন গর উপজেলায় ১২ হাজার ৯৯টি।

চুয়াডাঙ্গা সৌডি পোল্ট্রি ফিড সেন্টারের প্রোপাইটার ও নারিশ ফিড ডিলার সামসুল আলম বাবু বলেন,এক বছরে গো-খাদ্যের দাম বেড়েছে বস্তাপ্রতি ২০০ থেকে ৩০০ টাকা। ভূষি মিকস্ট খাদ্য ১০৭৫ টাকা, ক্যাটেল ফিডের ২৫ কেজি বস্তার দাম ১৪২৫ টাকা, দুধের জন্য একবস্তা খাবারের দাম ১৩২৫টাকা। সব মিলিয়ে খাবারের দাম বেশি। অনেক খামারী তাদের খামার বন্ধ করে দিয়েছে। খামারির সংখ্যা অনেক কম। তাদের ব্যবসা সেভাবে হচ্ছে না। বর্তমান যেসব খামারী টিকে আছে তারা বিভিন্ন সমস্যার মধ্যে দিয়ে দিন অতিবাহিত করছে। খাবারের দাম বেশি হওয়ার কারনে খামারিরা সেভাবে লাভ করতে পাচ্ছে না। খাদ্যের দাম বেশি হওয়ার কারনে মাংশের দামও বেশি।

জেলার বাড়াদি স্বপ্ন সাজ এগ্রো ফার্মের ম্যানেজার সহিদুল ইসলাম বলেন,আমাদের খামারে ২৩৫টি গরু আছে। এ খামারে বিভিন্ন জাতের গরু লালন পালন করা হয়। খাবার গুলো নেপিয়ার খাস দিয়ে ওর সাথে খড় দিয়ে ভূট্টার সাইলেন্স দিয়ে মিশিয়ে খাবার তৈরী করা হয়। গরুগুলি সুস্থ এবং সবল। খামারের গরু দেড় লাখ থেকে ১২ লাখ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়েছে। গত কোরবানির পর থেকে এ পর্যন্ত ৩০টি গরু বিক্রি হয়েছে। আমরা কোন গরু হাটে নিয়ে যায় না। খামার থেকে গরু বিক্রি হয়ে যায়।

আলমডাঙ্গা উদয়পুর আরিবা এগ্রো ফার্মের প্রেপাইটার ইখতিয়ার হোসেন জানান, ২০১৬ সাল থেকে এই ফার্মে গরু লালন-পালন করছি। কোরবানিতে আমার খামারে ২২টি গরু বিক্রি করার মত ছিল। ইতোমধ্যে ১৫টি গরু বিক্রি হয়েছে, এর মধ্যে ৮-৯টি দামী গরু। যেগুলি দশ লাখ বা তার চেয়ে বেশি দামে বিক্রি হয়েছে। তিনি আক্ষেপ করে বলেন,দু বছর আগে গরুর যে খাবার কিনেছি ১০ থেকে ১৪ টাকা কেজি দরে, সে খাবার এখন কিনতে হচ্ছে ৫৫ থেকে ৬০ টাকায়। তিনি বলেন, বিভিন্ন গরুর হাট থেকে কোয়ালিটি সম্পন্ন গরু কিনে এনে লালন পালন করে দেশের বিভিন্ন অংশে গরু সরবরাহ করি। তিনি আরো জানান, এ বছর অতিরিক্ত গরমের কারনে খামারে বিদ্যুৎ বিল অনেক বেশি হয়েছে। গত বছর গরমের সময় বিদ্যুৎ বিল আট হাজার টাকা আসতো, এ বছর সেখানে বিদু্ৎ বিল আসে ৩০ হাজার টাকা। গরমে গরুর ওজন বৃদ্ধি পায় না।

চুয়াডাঙ্গার শহরের বন্ধন এগ্রো ফার্মের কেয়ার টেকার কামরুজ্জমান বলেন, খামারে যে পরিমান খরচ হয় সে পরিমান লাভ হচ্ছে না। এভাবে চলতে থাকলে শুধু ছোট খামারী নয় অনেক খামার বন্ধ হয়ে যাবে। তিনি দুইটা গরু দেখিয়ে বলেন, আঠারো মাস আগে গরু দুইটি ১ লাখ ৩০ হাজার করে ২লাখ ৬০ হাজার টাকায় কিনেছি। এই ধরনের গরুর পিছনে বছরে প্রায় এক লাখ টাকা খরচ হয়। যদি দুই লাখ টাকায় গরু বিক্রয় করতে না পারি তাহলে পোষাবে না। তাজ উদ্দীন এগ্রো ফার্মের প্রোপাইটার হাজ্জাজ বিন তাহাজ বলেন, ২০০৭ সাল থেকে গরু লালন পালন করে আসাছি। গো-খাদ্যের দাম বৃদ্ধির কারনে গত বছরের তুলনায় ২০ থেকে ২৫ শতাংশ বাজারে প্রভাব পড়বে। গত বছর গরুর মাংশ ৬০০ থেকে ৬৫০ কেজি ধরে বেচাকেনা হয়েছে। এ বছর ৭৫০ টাকা থেকে ৮০০ টাকা কেজি ধরলে বিক্রি না করলে খামারিদের লাভ হবে না।

তিনি জানান, গত বছর থেকে গরু কালেকশন ও কম ছিল, বিক্রি ও কম হয়েছে। তিনি আরো জানান,যে ধরনের গরু লালন পালন করেন সে সব ব্রান্ডের গরু বর্তমানে বাংলাদেশ পাওয়া যাচ্ছে না। তিনি জানান, গত বছর কোরবানী থেকে এ পর্যন্ত ৫৭ টি গরু প্রায় ৩ কোটি টাকার বিক্রি হয়েছে। তিনি খামার এ পর্যন্ত আসার জন্য খাবারের মানের কথা উল্লেখ করেন। তিনি জানান, এই খামারে কাঁচা ঘাসের পর্যপ্ত ব্যবস্থা আছে, আবার খড় খাওয়াই। তিনি জানান ,বিভিন্ন দানাদার খাবারের মেট্টারিয়াল দোকান থেকে ক্রয় করে সম্পূর্ন প্রাকৃতিক উপায়ে খাবার তৈরী করে গরুর খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করি। তাজ উদ্দিন এগ্রো ফার্মে যে সব গরু আছে সেগুলোর প্রতিদিন কোনটির ৫০০টাকা, কোনটির ৭০০টাকা, আবার কোনটির ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা খাওয়া খরচ হয়।

তিনি জানান, আমি লট ধরে ১৫-২০টি গরু একসাথে বিক্রি করি।তিনি জানান, খামারে ৫০ লাখ টাকার উপরেও দামী গরু ও আছে। চুয়াডাঙ্গা জেলা প্রাণি সম্পদ কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমান(চলতি দায়িত্ব) জানান, চুয়াডাঙ্গা একটি প্রাণিসম্পদ সমৃদ্ধ জেলা। এ বছর কোরবানিতে চুয়াডাঙ্গায় চাহিদা রয়েছে ২লাখ ১১ হাজার ৮০৭টি। এর মধ্যে গরু ৫৪ হাজার ৯৭৯টি ও ছাগল ও ভেড়া মিলে ১ লাখ ৫৬ হাজার ৮২১টি। বাকী কোরবানির পশু চাহিদা অনুসারে বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করা হবে।

গরু গড়ে ১ লাখ ২০ হাজার থেকে ১ লাখ ৪০ হাজার টাকা বাজার মুল্য ধরা হয়েছে। আর প্রতিটি ছাগল ও ভেড়া গড়ে ধরা হয়েছে ১২ হাজার টাকা। গড়ে ১লাখ ৩০ হাজার টাকা গররু বাজার মূল্য ধরলে হয় ৭১৪ কোটি ৭২ লাখ ৭০ হাজার টাকায় ও ছাগলও ভেড়া গড়ে বাজার মূল্য ১২ হাজার টাকা দর ধরে বিক্রি করলে হয় ৮৮ কোটি ১৮ লাখ ৫২ হাজার টাকায় কোরবানি পশু বিক্রি হবে। গরু, ছাগল ও ভেড়ার মোট বাজারমূল্য হবে ৮০২ কোটি ৯১লাখ ২২ হাজার টাকা।

তিনি আরো জানান, চুয়াডাঙ্গা সীমান্তবর্ত্রী জেলা। শোনা যায় এ জেলায় চোড়ায় পথে কোর গরু আসার সম্ভাবনা থাকে। এ বছর এখন পর্যন্ত কোন অভিযোগ শোনা যায়নি। আমরা জেলা প্রশাসকের সাথে সব সময় যোগাযোগ রাখছি। এ ধরনের কোন সমস্যা দেখা দিলে আমরা জেলা প্রশাসকের সহযোগিতায় ব্যবস্থা গ্রহণ করবো।