ঐক্যফ্রন্টের দুই এমপির শপথ : সংবিধান বিশেষজ্ঞদের অভিমত

দৈনিক এই আমার দেশ দৈনিক এই আমার দেশ

জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের অন্যতম শরিক গণফোরামের দুই প্রার্থী সুলতান মোহাম্মদ মনসুর আহমেদ ও মোকাব্বির খান। ফাইল ছবি
নিজস্ব প্রতিবেদক : এমপি হিসেবে শপথ নেয়ার পর সুলতান মোহাম্মদ মনসুর আহমেদ এবং মোকাব্বির খানের ভাগ্য নির্ধারণে বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়াতে পারে। দলের সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে শপথ নিলে ঐক্যফ্রন্ট থেকে নির্বাচিত দুই নেতার সংসদ সদস্যপদ থাকবে কিনা তার ফয়সালা আদালতেই হবে বলে মনে করে সংবিধান বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ।

তারা বলেন, দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে শপথ নেয়া না-নেয়া সম্পর্কে সংবিধানেও স্পষ্ট করে কিছু বলা নেই। বিষয়টি নতুন করে সামনে এসেছে। তাই এটি সুরাহার জন্য শেষ পর্যন্ত তা আদালতে গড়াবে। সে ক্ষেত্রে ফয়সালা হবে আদালতেই।

সুপ্রিমকোর্টই একমাত্র সংবিধানের ব্যাখ্যা দিতে পারেন বলে তারা মনে করেন। এ প্রসঙ্গে সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক রোববার যুগান্তরকে বলেন, ‘সংসদ প্রতিষ্ঠার পর বিষয়টি এবারই প্রথম সবার সামনে এসেছে।

এ বিষয়ে সংবিধানেও সুনির্দিষ্ট কোনো ব্যাখ্যা নেই। তাই হুট করে তাদের সদস্যপদ থাকা না-থাকা নিয়ে বলাটা কঠিন। তিনি আরও বলেন, সংবিধানে এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো ব্যাখ্যা না থাকায় শেষ পর্যন্ত তা আদালতে গড়াতে পারে। আদালতই এর ফয়সালা দেবেন।

সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদে বলা আছে, ‘কোনও নির্বাচনে কোনও রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরূপে মনোনীত হইয়া কোনও ব্যক্তি সংসদ-সদস্য নির্বাচিত হইলে তিনি যদি উক্ত দল হইতে পদত্যাগ করেন, অথবা সংসদে উক্ত দলের বিপক্ষে ভোটদান করেন, তাহা হইলে সংসদে তাহার আসন শূন্য হইবে, তবে তিনি সেই কারণে পরবর্তী কোনও নির্বাচনে সংসদ-সদস্য হইবার অযোগ্য হইবেন না।’

দলের সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট থেকে নির্বাচিত গণফোরামের দুই নেতা সুলতান মোহাম্মদ মনসুর আহমেদ এবং মোকাব্বির খান ৭ মার্চ সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নিতে যাচ্ছেন।

স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী তার কার্যালয়ে এদিন বেলা সাড়ে ১১টায় এ দু’জনকে শপথবাক্য পাঠ করাবেন। ৭ মার্চ শপথ নেয়ার আগ্রহ প্রকাশ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ জানিয়ে সুলতান মোহাম্মদ মনসুর আহমেদ এবং মোকাব্বির খান শনিবার আলাদা আলাদাভাবে স্পিকার বরাবর চিঠি দেন। এ চিঠি পেয়েই স্পিকারের কার্যালয় দুই সংসদ সদস্যের শপথ অনুষ্ঠান আয়োজনের কথা জানায়।

এরপর দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে দু’জন শপথ নিলে তাদের ভাগ্যে কি ঘটবে- এ বিষয়টি আলোচনায় উঠে আসে। গণফোরামের একাধিক নেতা জানান, ৭ মার্চের আগেই সুলতান মোহাম্মদ মনসুর আহমেদ এবং মোকাব্বির খানের বিষয়ে দলীয় ফোরামে তারা সিদ্ধান্ত নেবেন। এ সিদ্ধান্ত চিঠির মাধ্যমে জাতীয় সংসদের স্পিকার এবং প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে (সিইসি) অবহিত করা হবে।

অবশ্য এ ইস্যুতে সংবিধান বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে আরও দু’ধরনের ব্যাখ্যা পাওয়া গেছে। একপক্ষ বলেছে, দলের সিদ্ধান্তের সঙ্গে শপথ গ্রহণ এবং সদস্যপদ না থাকার কোনো সম্পর্ক নেই।

এ অংশের মতে, জনগণের ভোটে নির্বাচিত একজন সংসদ সদস্য শপথ নেবেন- এটাই স্বাভাবিক। শপথ নেয়ার পর যদি কেউ সংসদে দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে ৭০ অনুচ্ছেদ লঙ্ঘন করেন তখন তার সদস্যপদ থাকা না-থাকার বিষয়টি সামনে আসবে।

অন্যদিকে সংবিধান বিশেষজ্ঞদের আরেকটি অংশ মনে করে, দলীয় প্রতীক নিয়ে নির্বাচিত একজন সদস্য প্রথমত দলের কাছেই দায়বদ্ধ। তাই দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে কেউ কোনো পদক্ষেপ নিলে তা হবে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ লঙ্ঘনের শামিল। এ অংশের মতে, এ কারণে শপথ নিলেও সদস্যপদ হারাবেন সুলতান মোহাম্মদ মনসুর আহমেদ ও মোকাব্বির খান।

জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ও সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ বলেন, সংবিধান অনুযায়ী একজন সংসদ সদস্য জনগণের ভোটে নির্বাচিত হন। তাই শপথ নেয়া তার অধিকার।

এমনকি এটি তার সাংবিধানিক দায়িত্ব। বরং নির্বাচিত হয়েও শপথ না নিলে তিনি কার্যত সংবিধান লঙ্ঘন করবেন। তিনি বলেন, শপথ নেয়ার পর যদি কেউ সংসদে দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে ভোট দিয়ে ৭০ অনুচ্ছেদ লঙ্ঘন করেন- তখন তার সদস্যপদ থাকা না-থাকার বিষয়টি সামনে আসবে। এর আগে এ বিষয়টি সামনে আসার কোনো কারণ নেই।

অন্যদিকে বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা, সুপ্রিমকোর্ট আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি ও সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, দলীয় প্রতীক নিয়ে নির্বাচিত একজন সদস্য প্রথমত দলের কাছেই দায়বদ্ধ। তাই দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে কেউ কোনো পদক্ষেপ নিলে তা হবে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ লঙ্ঘনের শামিল। তিনি আরও বলেন, এ কারণে শপথ নিলেও সদস্যপদ হারাবেন সুলতান মোহাম্মদ মনসুর আহমেদ ও মোকাব্বির খান।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সুলতান মোহাম্মদ মনসুর আহমেদ মৌলভীবাজার-২ আসনে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে নির্বাচিত হন। আর মোকাব্বির খান গণফোরামের দলীয় প্রতীক উদীয়মান সূর্য নিয়ে সিলেট-২ আসন থেকে নির্বাচিত হন। তারা দু’জনই ড. কামাল হোসেন নেতৃত্বাধীন গণফোরামের স্থায়ী কমিটির সদস্য।

৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হলেও দলীয় সিদ্ধান্তে এতদিন শপথ নেননি তারা। তবে এবার তারা দল ও জোটের সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করেই স্বাধীনতার এ মাসে শপথ নেয়ার সিদ্ধান্ত নেন। জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সিদ্ধান্ত রয়েছে- একাদশ সংসদ নির্বাচনে জোট থেকে নির্বাচিত আটজনের কেউই শপথ গ্রহণ করবেন না। জোটের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে শপথ গ্রহণ করলে তাদের দল থেকে বহিষ্কার করার চিন্তা রয়েছে গণফোরামেরও।

দলের দুই সংসদ সদস্যের শপথ নেয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে গণফোরাম সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা মহসিন মন্টু বলেন, আমরা (জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট) এখন পর্যন্ত শপথ না নেয়ার সিদ্ধান্তে অটল রয়েছি। এখন কেউ এ সিদ্ধান্ত অমান্য করে শপথ গ্রহণ করলে তার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। দলের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী যদি বহিষ্কারের নিয়ম হয়, তাহলে তাদের বহিষ্কার করা হবে।

মোস্তফা মহসীন মন্টু বলেন, জনগণের সঙ্গে আমরা প্রতারণা করতে পারব না। জনগণ যে আস্থা আমাদের ওপর রেখেছে সেই আস্থার খেয়ানত আমরা করব না। একাদশ সংসদ নির্বাচনের আগে ১০ নভেম্বর গণফোরামের প্রাথমিক সদস্য হয়েছিলেন সুলতান মোহাম্মদ মনসুর।

তার প্রাথমিক সদস্য হওয়ার কাগজ দেখিয়ে মন্টু আরও বলেন, আমাদের দলের সদস্য হওয়ার আবেদন ফরমে লেখা আছে, ‘আমি গণফোরামের নীতি-আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে, সর্বদা দলের গঠনতন্ত্র, কর্মসূচি, নিয়ম-কানুন, আদেশ-নির্দেশ ও দলীয় শৃঙ্খলা মেনে চলার অঙ্গীকার করে এর প্রাথমিক সদস্য হওয়ার জন্য আবেদন করছি।’

মন্টু বলেন, তাহলে এখন আমাদের দল গণফোরাম ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সিদ্ধান্ত হল- শপথ না গ্রহণ করা। তাহলে সেই সিদ্ধান্ত অমান্য করে সুলতান মনসুর শপথ গ্রহণ করলে আমরা তার বিরুদ্ধে দলীয় ও আইনগত পদক্ষেপ নেব। গণফোরামের গঠনতন্ত্রের ৮ ধারায় বলা হয়েছে, ‘কেউ দলের শৃঙ্খলা ভঙ্গ করলে তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হবে। তবে তার আগে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেয়া হবে।’ মন্টু আরও বলেন, এটায় কারও দ্বিমতের কোনো অবকাশ নেই।

যারা শপথ নিতে যাচ্ছেন তারা নিজেদের ব্যক্তিগত উদ্যোগে করছেন। এটা দলীয় সিদ্ধান্ত না। তিনি বলেন, আমরা স্পষ্ট করে বলতে চাই, জনগণের সঙ্গে আমরা প্রতারণা করব না। ৭ দফা দাবির প্রতি আস্থা রেখে আমরা নির্বাচন করেছিলাম। এখন হঠাৎ করে কী কারণে সরকারের প্রতি তারা আস্থাশীল হয়ে শপথ নিতে যাচ্ছেন, আমি জানি না।

মোকাব্বির খানের বিষয়ে মোস্তফা মহসীন মন্টু বলেন, আমরা আজ তাকে মিটিংয়ে ডেকেছিলাম। কিন্তু তিনি সভায় আসেননি। তিনি শপথ গ্রহণ করলে তার বিরুদ্ধে একই ব্যবস্থা নেয়া হবে। দু’জন শপথ নিলে তাদের সদস্যপদ বাতিল করতে স্পিকার ও নির্বাচন কমিশনে গণফোরাম চিঠি দেবে কি না, জানতে চাইলে মন্টু বলেন, অবশ্যই আমরা সব ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করব। তবে দলের সভাপতি ড. কামাল হোসেনসহ বৈঠক করে পরবর্তী করণীয় ঠিক করব আমরা।

সুলতান মোহাম্মদ মনসুর আহমেদ বলেন, আমি শপথ নেব। শত প্রতিকূলতার মধ্যে জনগণ আমাকে ভোট দিয়ে নির্বাচিত করেছেন, তাদের ভোটের সেই মর্যাদা দিতেই আমি শপথ নেব। তিনি বলেন, আমি জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার প্রতিনিধি হিসেবে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টে যোগ দিয়েছি। কিন্তু নির্বাচন করতে হলে নিবন্ধিত দলের সদস্য হতে হয়, তাই আমি গণফোরামের সদস্য হিসেবে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছি। এখন তারা যদি আমাকে দল থেকে বহিষ্কার করে, সেটিকে আমি কেয়ার করি না। তাদের যা সিদ্ধান্ত নেয়ার, নিতে পারে।

অন্যদিকে, মোকাব্বির খান শনিবার বলেন, আমি দলের (গণফোরাম) সিদ্ধান্ত নিয়েই মার্চের প্রথম সপ্তাহে শপথ নেব। দলের সভাপতি ড. কামাল হোসেনের সঙ্গে কথা বলেই শপথ নিতে যাচ্ছি। তিনি শপথের বিষয়ে ইতিবাচক।

এদিকে সুলতান মোহাম্মদ মনসুর আহমেদ ও মোকাব্বির খানের শপথ নেয়ার সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে শাসক দল আওয়ামী লীগ। দলটির সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য কর্নেল (অব.) মুহম্মদ ফারুক খান বলেন, গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রায় এ সিদ্ধান্ত অবশ্যই ইতিবাচক। আমরাও মনে করি, জনগণ তাদের ভোট দিয়েছে। তাদের উচিত জনগণের ভোটাধিকারের প্রতি সম্মান দেখিয়ে শপথ নিয়ে সংসদে আসা। জনগণের পক্ষে কথা বলা।

অপরদিকে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের প্রধান শরিক দল বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. মঈন খান বলেন, দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে শপথ নেয়া স্রেফ বিশ্বাসঘাতকতা। তবে যেহেতু সুলতান মোহাম্মদ মনসুর আহমেদ ও মোকাব্বির খান গণফোরামের সদস্য, এখানে বিএনপির কিছু করার নেই। তাদের বিষয়ে যে সিদ্ধান্ত নেয়ার তা গণফোরামই নেবে।

একাদশ জাতীয় সংসদের সদস্যরা ৩ জানুয়ারি শপথ গ্রহণ করেন। এরপর ৩০ জানুয়ারি একাদশ সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরু হয়। সংসদ অধিবেশন শুরু হলেও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নির্বাচিত আট সদস্য এখন পর্যন্ত শপথ নেননি।

সংসদের কার্যপ্রণালি বিধি অনুযায়ী সংসদ নির্বাচনের গেজেট প্রকাশের পর পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচিত কেউ শপথ না নিলে তার আসন শূন্য হয়ে যায়। সেই হিসাবে ৩০ এপ্রিলের মধ্যে যারা শপথ না নেবেন, তাদের আসন শূন্য হয়ে যাবে। এ অবস্থায় নির্ধারিত সময়ের আগেই শপথ গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেন সুলতান মোহাম্মদ মনসুর আহমেদ ও মোকাব্বির খান।