উপকূলীয় কয়রায় বুলবুলের তাণ্ডবে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি

নিতিশ সানা, কয়রা ঃ রাস্তার মাঝে পড়ে আছে সারি সারি গাছ। গৃহহারা মানুষেরা নির্বাক তাকিয়ে আছে বিদ্ধস্ত গৃহের দিকে। বিলের ধান গুলো সব লুটিয়ে পড়ে আছে পানিতে। থই
থই পানিতে একাকার হয়ে গেছে মৎস ঘের। এই চিত্র ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের তান্ডবে লন্ডভন্ড উপকূলীয় উপজেলা কয়রার। ঘুর্ণিঝড়ের কবলে বিদ্যুতের লাইন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বিদ্যুত বিচ্ছিন্ন পুরো এলাকা। ব্যাপক ক্ষতিতে দিশেহারা হয়ে পড়েছে এলাকার জনসাধারণ। প্রলয়ংকরী এই ঝড়ে সবকিছু হারিয়ে নিঃস্ব মানুষগুলো এখন সরকারি সহযোগিতার দিকে তাকিয়ে আছে।
ক্ষতিগ্রস্তদের সবধরণের সহযোগীতার আশ্বাসও দিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন। বুলবুলের তান্ডবে লন্ডভন্ড হয়ে গেছে কয়রা উপজেলার ৭টি ইউনিয়নের প্রায় পাঁচ হাজার ঘরবাড়ি, হাজার হাজার গাছপালা, ছোট বড় কয়েক হাজারের মতো মৎস ঘের ও শত শত একর ফসলি জমি।উপজেলা শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা যায়, ৪৭ টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বিধ্বস্ত হয়েছে । উপজেলা কৃষি অফিস জানায়, এই উপজেলায় মোট ৫ হাজার ৬৯০ হেক্টর জমিতে আমন চাষ হয়েছিল তারমধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ১৭২০ হেক্টর জমির আমন ফসল। ২০০ হেক্টর জমিতে চাষাবাদ কৃত সবজির মধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ১৬০ হেক্টর। ৫৫০ হেক্টর জমিতে ফল চাষ হয়েছিল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ১৬৫ হেক্টর জমির ফল। উপজেলা মৎস্য অফিস সূত্রে জানা যায় ৩ হাজার ২৬০ টি মৎস্য ঘের পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে। যার আয়তন ৩৩শ হেক্টর। গত ৮ নভেম্বর শুক্রবারের থেকেই মূলত উপকূলীয় উপজেলা কয়রায় বৈরী আবহাওয়া বিরাজ করে। এরপর শনিবার (৯ নভেম্বর) সকাল থেকে থেমে থেমে মাঝারি ধরনের বৃষ্টিপাত শুরু হয়, বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাতাসের গতিবেগও বাড়তে থাকে। আবহাওয়া অফিস থেকে ঘোষনা আসে ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের কারণে দিনভর বৃষ্টি অব্যাহত থাকবে এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাতাসের গতিবেগ বাড়বে।। ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে ৫ থেকে ৭ ফুট উচ্চতায় জলোচ্ছ্বাস হতে পারে যে কারণে ১০ নম্বর মহাবিপদ সংকেত দেখাতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি উপকূলীয় উপজেলা কয়রাও ১০ নম্বর মহাবিপদ সংকেতের আওতায় থাকবে। এমন ঘোষনা শুনে আতঙ্কিত হয় এই উপজেলার বাসিন্দারা কারণ এই অঞ্চলের নদীর বেড়ীবাঁধ গুলি প্রচন্ড ঝুঁকিপূর্ণ। সরেজমিনে শনিবার সকালে হরিণখোলা ২ নং কয়রা উত্তর বেদকাশি সহ কয়েকটি এলাকায় গিয়ে দেখাযায় এলাকা গুলির বহু মানুষ উৎকন্ঠা নিয়ে বেড়িবাঁধের রাস্তায় দাড়িয়ে আছে । তাঁরা আশঙ্কা করছেন, ঘূর্ণিঝড় বুলবুল আঘাত হানলে গ্রামের সামনের ছোট্ট বেড়িবাঁধটি ভেঙে যাবে।
এতে লোনা পানিতে পুরো এলাকা ভেসে যাবে। এসময় দেখাযায় অনেকে দড়ি দিয়ে শক্ত
করে ঘর-বাড়ি বেঁধে রাখার চেষ্টা করছেন। অনেকে গরু–ছাগল নিয়ে নিরাপদ জায়গায় চলে যাচ্ছেন। সেসময় হরিণখোলা এলাকার ৬০ উদ্ধ বয়সের বৃদ্ধ কেরামত শেখের সাথে কথা হলে তিনি বলেন, ‘চরম আতঙ্কের মধ্যে আছি। সত্যি সত্যি যদি ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানে, তবে পুরো এলাকা ভেসে যাবে। এ এলাকায় প্রায় হাজার খাানেক মানুষ বাস করে।’ হরিণখোলা এলাকাটি পানি উন্নয়ন বোর্ডের ১৩-১৪ / ২ পোল্ডারের আওতায়। ১০ বছর আগে ঘূর্ণিঝড় আইলায় এখানে ব্যাপক খতি হয়েছিল। সে স্মৃতি এখনো মানুষের মনে গেঁথে আছে। তাই ঘূণিঝড়ের নাম শুনলেই প্রতিটি মানুষ আতঙ্কিত হয়। শনিবার বিকেল থেকেই আশ্রয় কেন্দ্রের দিকে যাওয়া শুরু করে মানুষ যা স্রোতের আকার ধারণ করে সন্ধা হবার সাথে সাথে। একটু রাত বাড়তেই কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায় আশ্রয় কেন্দ্রগুলো। গবাদি পশু আর মানুষের ঠাশাঠাশি অবস্থান যেন ভয়ঙ্কর কিছুর পূর্বাভাষ দিচ্ছিল।

রাত সাড়ে তিনটা থেকেই শুরু হয় বুলবুলের তান্ডব লিলা, টানা ছয় ঘন্টা চলে
প্রলয় শেষ হয় সকাল সাড়ে সাতটার দিকে। এতেই পাল্টে গেছে কয়রা উপজেলার
চেহারা। সকালে বাতাসের গতি একটু কমে আসলে দেখা যায় কয়রা সদর ইউনিয়নের
মধ্য বিল এলাকার মুনছুর গাইনের ঘরের টিনের চাল উড়ে গিয়ে পড়ে আছে প্রায় ২০০
ফুট দূরে। রান্নার জায়গার টিনের চাল উড়ে গিয়ে আটকে আছে দূরের একটি গাছের
ডালে। বুলবুলের তান্ডবে তার সমেত উপড়ে পড়েছে স্থানীয় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের
সামনের একটি বিদ্যুতের খুঁটি। কয়রা সদর ইউনিয়নের গোবরা গ্রামের আঃ জলিল জানান, পরিবার নিয়ে রাতে ছিলেন নিকটস্থ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের আশ্রয় কেন্দ্রে। সকালে ঝড় থেমে গেলে বাড়ি ফিরে দেখেন বসত ঘরের পাশের সিরিস গাছটির নিচে চাপা পড়ে আছে ঘরের চাল ও দেয়ালের একাংশ। গাছটি কেটে আবার পুনরায় ঘর তৈরী করতে হবে জানান তিনি। মদিনাবাদ গ্রামের সফুরা বেগম বলেন, ‘‘সন্ধ্যায় বাড়িতেই ছিলাম। হঠাৎ আকাশ কালো হয়ে আসে। শেষ রাতের দিকে শুরু হয় ভয়ঙ্কর ঝড়। নতুন তৈরি সিমেন্টের বাড়িটা ঝড়ে দুলছিল। একটা সময়ে জোর শব্দে টিনের ছাউনি উড়ে যায়। আমরা মা আর ছেলে মিলে খাটের নিচে কোনও রকমে বসে রাত পার করেছি।’’উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা জাফর রানা জানান, ক্ষয়ক্ষতির পরিমান সঠিকভাবে নিরপন করা না গেলেও এ মুহুর্তে উপজেলার সাতটি ইউনিয়নে পাঁচ হাজারের মতো ঘর বাড়ি বিদ্ধস্ত হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে ।

সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত, উপজেলার দক্ষিণ বেদকাশী ইউপি চেয়ারম্যান কবি শামসুর রাহমান জানান, তার ইউনিয়নে কয়েক হাজার বিঘা জমির মৎসঘের ঘের ভেসে গেছে। ঘরবাড়ি বিদ্ধস্ত হয়েছে প্রায় দুই হাজারের অধিক। উত্তরবেদকাশী ইইউপি চেয়ারম্যান সরদার নুরুল ইসলাম জানান, তার ইউনিয়নে পাঁচ শতাধিক ঘরবাড়ি বিদ্ধস্ত হয়েছে । প্রায় বিশ হাজার গাছপালা নষ্ট হয়েছে। বাগালী ইউপি চেয়ারম্যান আঃ সাত্তার পাড় জানান, তার ইউনিয়নে প্রায় পাঁচ শতাধিক ঘরবাড়ি বিদ্ধস্ত হয়েছে । বিশেষ করে বেশকিছু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান বিদ্ধস্ত হয়েছে । ভেসে গেছে শতাধিক মৎসঘের । এদিকে ঝড়ে তিগ্রস্তদের সবধরণের সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা। ইতিমধ্যে তারা ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলো পরিদর্শন করেছেন।

কয়রা উপজেলা নির্বাহী অফিসার শিমুল কুমার সাহা এই আমার দেশকে বলেন, সকাল থেকে উপজেলা প্রশাসন, ফায়ার সার্ভিসসহ স্থানীয় ভলেন্টিয়ারদের সমন্বয়ে রাস্তা থেকে গাছ
অপসারনের কাজ করা হয়েছে। ক্ষয়ক্ষতি সম্পর্কে জেলা প্রশাসককে অবহিত করা
হয়েছে। অতি দ্রুত সময়ের মধ্যে ক্ষতিগ্রস্থদের পুনঃবাসনের কাজ শুরু করা হবে।
তিনি আরো বলেন (ইউ এন ও )দূর্যোগ পরবর্তী পরিস্থিতিতে মানবিক সহায়তা কর্মসূচির আওতায় উপজেলার সাতটি ইউনিয়নে সরকারিভাবে ২ লক্ষ ৫০হাজার টাকা, ৫০মেট্রিক টন চাল ও ৭০০ প্যাকেজ শুকনা খাবার বরাদ্দ পাওয়া গেছে। ত্রাণ সহায়তা হিসাবে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার প্রতি ১০ কেজি চাল ১ কেজি ডাল ১ কেজি তেল ১ কেজি লবণ এক কেজি চিনি ২কেজি চিড়া ও আধা কেজি নুডুলস । এই ত্রাণ সহায়তা অতি দ্রুত সময়ের মধ্যে ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে বিতরণ করা হবে। তবে ভয়াবহ এ ঝড়ের কবলে পড়া ভুক্তভোগী জনসাধারণের পুনর্বাসনে কার্যকারী ভূমিকা রাখবে সরকার, এমনটাই প্রত্যাশা কয়রাবাসীর।