আজ শাহজাহনের প্রেয়সী মমতাজের মৃত্যু বার্ষিকী

এই আমার দেশ ডেস্ক : মুমতাজ মহল সাধারণ ডাকনাম আরজুমান্দ বানু বেগম।শাহজাহানের প্রেয়সী মুমতাজ। আজ তাঁর মৃত্যু বার্ষিকী। ১৬৩১ সালের ১৭ জুন তিনি মারা যান।
মুমতাজ মহলের জন্ম ১৫৯২ খ্রিস্টাব্দের ২৭ এপ্রিল উত্তর ভারতের আগ্রায়। জনশ্রুতি আছে, প্রথম দেখাতেই বালিকা মুমতাজ মহলের আকর্ষণে মুগ্ধ হন বালক শাহজাহান। সেই মুগ্ধতাই ধীরে ধীরে পরিণত হয়েছিল কালোত্তীর্ণ ভালবাসার মহাকাব্যে। বাগদানের প্রায় ৫ বছর পর ১৬১২ খ্রিস্টাব্দের ৩০ এপ্রিল আনুষ্ঠানিকভাবে বিবাহ সম্পন্ন হয় তাদের। মুমতাজ মহলের বয়স তখন ১৯ বছর এবং শাহজাহানের ২০ বছর।
শাহজাহানের জন্মের সময় মুঘল সম্রাট ছিলেন মুঘলে আজম আকবর। পিতামহের ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যেই বাল্যকাল কেটেছিল শাহজাদা খুররমের। ছোটবেলা থেকেই শাহজাদা খুররম ছিলেন বুদ্ধিমান, বিচক্ষণ এবং সাহসী। তবে জাহাঙ্গীরের সিংহাসন আরোহন পরবর্তী সময়ে দরবারের জটিল রাজনৈতিক দোলাচাল থেকে নিজেকে অত্যন্ত সতর্কভাবে সরিয়ে রেখেছিলেন শাহজাদা। ফলে জাহাঙ্গীরের শাসনামলের একদম শুরু থেকে দরবারের আমির ওমরাহ্‌দের কাছে যথেষ্ট গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিত্ব ছিলেন তিনি। তবে মুঘল রাজনীতির দৃশ্যপটে শাহজাদা খুররমের ধূমকেতুর মতো আবির্ভাব ঘটে ১৬১৪ খ্রিস্টাব্দে। দীর্ঘ এক বছর ধরে চলা অভিযানে ২২ বছর বয়সী এই শাহজাদা মেবারের রাজপুতদের অত্যন্ত শোচনীয়ভাবে পরাজিত করেন। এছাড়া ১৬১৭ খ্রিস্টাব্দে দাক্ষিণাত্যে বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে আশাতীত সাফল্য তাকে এনে দেয় অভূতপূর্ব খ্যাতি। স্বয়ং সম্রাট জাহাঙ্গীর তাকে ‘শাহজাহান’ অর্থাৎ সারা জাহানের শাহ বা রাজা উপাধিতে ভূষিত করেন। একজন শাহজাদার জন্য মাত্র ২৫ বছর বয়সে এত মর্যাদাপূর্ণ উপাধি অর্জন করা কল্পনাতীত সম্মানের ব্যাপার ছিল। ফলে অল্প সময়েই শাহজাহান পরিণত হলেন দরবারের সকলের চোখে সমীহের পাত্রে।
তবে রাজক্ষমতার সমীকরণ কোনোদিনই সরল ছিল না। জাহাঙ্গীরের উপর ক্রমে প্রভাব বিস্তার করতে থাকা সম্রাজ্ঞী নুরজাহান একদিকে যেমন ছিলেন শাহজাহানের সৎ মা এবং অন্যদিকে ফুপু শাশুড়ি। কিন্তু তার পরিকল্পনা ছিল জাহাঙ্গীরের কনিষ্ঠপুত্র শাহরিয়ারকে পরবর্তীতে সিংহাসনে বসানো। সে উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের পথে অনেক দূর এগিয়েও গিয়েছিলেন নুরজাহান। তার আগের ঘরে জন্ম নেওয়া মেয়ে লাডলি বেগমকে বিয়ে দিয়েছিলেন শাহজাদা শাহরিয়ারের সাথে। তবে বিচক্ষণ শাহজাহান এবং তার শ্বশুর আসাফ খানের দাপটের সামনে নুরজাহানের মতো প্রতাপশালী সম্রাজ্ঞীও টিকে থাকতে পারেন নি, যদিও আসাফ খান ছিলেন নুরজাহানেরই আপন ভাই। জাহাঙ্গীরের মৃত্যুর পর অনেক ঘাত-প্রতিঘাত, বিদ্রোহ-পাল্টা বিদ্রোহ পেরিয়ে অবশেষে ১৬২৮ সালে সিংহাসনে আরোহন করেন শাহজাহান। অন্যদিকে একসময়ের সাম্রাজ্য কাঁপানো দাপুটে নুরজাহান এবং তার কন্যা লাডলি বেগমকে রাজদরবার থেকে নির্বাসন দিয়ে লাহোরে নজরবন্দী রাখা হয়।
বিদ্রোহ দমনে কঠোরহস্ত, ক্ষমতার রাজনীতিতে সুকৌশলী এবং শক্ত হাতে সাম্রাজ্য চালানো সম্রাট শাহজাহানের শাসক পরিচয় তার প্রেমিক পরিচয়ের নিচে চাপা পড়ে গেছে। কারণ শাসক শাহজাহানের পরাক্রম তার সিংহাসনচ্যুতির সাথে হারিয়ে গেলেও, প্রেমিক শাহজাহান তাজমহলের মাধ্যমে আজও জনগণের মানসপটে প্রবল পরাক্রমে বেঁচে আছেন। কেন প্রেমিক শাহজাহান ইতিহাসে অনন্য? এর পেছনের কারণ কি শুধুই মৃত প্রেয়সীর স্মৃতি জাগরূক রাখতে কল্পনাতীত ব্যয়বহুল এক সমাধি নির্মাণ? নাকি জীবদ্দশায়ও মুমতাজ-শাহজাহানের প্রেমের উপাখ্যান কোনো অংশে কম ছিল না? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পেতে আমাদের ফিরে যেতে হবে আজ থেকে ঠিক চারশ বছর আগে।
সেই সময়ে রাজপুরুষদের বহুগামিতা সর্বজনবিদিত এবং স্বীকৃত। মুঘলরাও এর ব্যতিক্রম ছিলেন না। প্রত্যেক শাহজাদা এবং সম্রাট ছিলেন আলাদা আলাদা মহলের মালিক, যেখানে থাকতেন তাদের স্ত্রী এবং পরিচারিকাগণ। সেই ধারাবাহিকতায় ভবিষ্যত সম্রাট শাহাজাদা খুররমের সান্নিধ্য লাভের জন্যও ব্যাকুল ছিলেন বহু নারী। তবে শাহজাহান একটি জায়গায় অন্যদের চেয়ে একদম আলাদা ছিলেন। সেটা ছিল মুমতাজের সাথে তার ব্যক্তিগত প্রণয়। মধ্যযুগে ভারতীয় রাজপরিবারে দাম্পত্য সম্পর্ক আবর্তিত হত জৈবিক প্রয়োজন, উত্তরাধিকার জন্ম দেয়ার আকাঙ্ক্ষা এবং অন্যান্য রাজনৈতিক উদ্দেশ্যকে ঘিরে। ব্যক্তিকেন্দ্রীক ভালবাসার অস্তিত্ব রাজপরিবারগুলোতে ছিল বিরল। কিন্তু মুমতাজ মহল এবং শাহজাহানের ক্ষেত্রে এই সবকিছুকে ছাপিয়ে প্রাধান্য পেয়েছিল পারস্পরিক সম্পর্ক এবং সুগভীর রোমান্টিসিজম।
মুমতাজ মহল ছাড়াও শাহজাহানের অন্য দুজন স্ত্রী ছিলেন। কিন্তু সেই বিয়েগুলো ছিল শুধু রাজনৈতিক প্রয়োজনে। অন্যদিকে মুমতাজ মহল শুধু তার সহধর্মিণীই ছিলেন না, ছিলেন একান্ত পরামর্শক এবং সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধু। এককথায়, মুমতাজ মহল ছিলেন শাহজাহানের আদর্শ জীবনসঙ্গিনী এবং সার্বক্ষণিক সহচর। সম্রাট হওয়ার পর শাহজাহানের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে মুমতাজ মহলের যথেষ্ট প্রভাব ছিল। শুধু তা-ই নয়, অভিযানগুলোতে শাহজাহানের সঙ্গী হিসেবে থাকতেন তিনি। উনিশ বছরের দাম্পত্য জীবনে মুমতাজ মহলের গর্ভে জন্ম নিয়েছিল শাহজাহানের চৌদ্দজন সন্তান, যদিও তাদের মধ্যে মাত্র সাতজন শৈশব অতিক্রম করতে পেরেছিলেন। শাহজাহানের উত্তরসূরি সম্রাট আওরঙ্গজেব এই রাজদম্পতিরই সন্তান। আর তাই তো আরজুমান্দ বানু বেগম ধীরে ধীরে হয়েছিল শাহজাহানের মহলের সেই বিশেষ একজন, যার এককথায় প্রকাশ হলো মুমতাজ মহল। মুমতাজ মহল প্রকৃতপক্ষেই এই উপাধির যোগ্য ছিলেন।
তবে নশ্বর মানুষের জীবনে ভালবাসা চিরদিন মিলনাত্মক থাকে না। মৃত্যুর অনিবার্যতাকে এড়াতে পারে না পৃথিবীর কোনো জীবিত সত্ত্বা। শাহজাহান ও মুমতাজ মহলের মত রাজকীয় দম্পতিও সেই নির্মম সত্যের মুখোমুখি হলেন অনেকটা আকস্মিকভাবে। ১৬২৯ খ্রিস্টাব্দে দাক্ষিণাত্যে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠা বিদ্রোহ দমনের উদ্দেশ্যে অভিযান শুরু করলেন সম্রাট শাহজাহান। সাথে নিয়ে গেলেন মুমতাজ মহলকেও। দীর্ঘ দুই বছর ধরে চলা এই অভিযানের মাঝখানে অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়লেন সম্রাজ্ঞী। দীর্ঘ যাত্রায় দিনে দিনে ক্লান্ত হয়ে পড়ছিলেন তিনি। এদিকে দ্রুত ঘনিয়ে আসছিল সন্তান জন্ম দেয়ার সময়। দুঃখজনকভাবে, সন্তান জন্ম দেওয়ার সময় ঘটল চূড়ান্ত বিপত্তি।
দীর্ঘ ৩০ ঘন্টার অসহনীয় প্রসব বেদনার পর, মুমতাজ মহল অবশেষে কন্যাসন্তান জন্ম দিলেন। কিন্তু অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের ফলে চৌদ্দতম সন্তান জন্মদানের ধকল সামলাতে পারল না সম্রাজ্ঞীর ভঙ্গুর শরীর। কথিত আছে, প্রসব বেদনায় কাতর মুমতাজ মহলের অবর্ণনীয় যন্ত্রণা দেখে হতবিহবল শাহাজাদী জাহানারা নাকি মায়ের আরোগ্যের জন্য অকাতরে দান-সদকাহ করতে শুরু করেছিলেন। কিন্তু সম্রাজ্ঞীর তক্বদীরে লিখা ছিল অন্য কিছু। পরাক্রমশালী শাহজাহানের জাহান কাঁদিয়ে ১৬৩১ সালের ১৭ জুন মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লেন সম্রাটের মহলের অমূল্য রত্ন ‘মুমতাজ মহল’। মুমতাজের মৃত্যুতে শাহজাহান এতটাই শোকাচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিলেন যেন আচমকা তার রং, রূপ ও সৌন্দর্যের জাঁকজমকমন্ডিত পৃথিবীতে বেদনার জলোচ্ছ্বাস এসে সবকিছু লন্ডভন্ড করে দিয়ে গেল। এক বছরের শোক ঘোষণা করলেন সম্রাট নিজে, চলে গেলেন লোজচক্ষুর অন্তরালে। ঠিক এক বছর পর সম্রাট যখন জনসম্মুখে হাজির হলেন, ততদিনে তার চুল এবং শ্মশ্রুতে পাক ধরে গেছে, চোখে-মুখে বার্ধক্য এবং বিরহের ছাপ ছিল সুস্পষ্ট।
কথিত আছে, মৃত্যুশয্যায় মুমতাজ মহল শাহজাহানকে তার শেষ ইচ্ছা হিসেবে জানিয়েছিলেন যেন তাকে এমন এক সমাধিস্থলে সমাহিত করা হয় যার সৌন্দর্য গোটা পৃথিবীর মানুষ মুগ্ধ নয়নে দেখবে। তবে মুমতাজ মহল অন্তিম সময়ে এমন ইচ্ছার কথা সত্যিই ব্যক্ত করেছিলেন কিনা সেটা নিশ্চিতভাবে জানা না গেলেও, সম্রাট শাহজাহান যে এই আকস্মিক মৃত্যুতে অসম্ভব প্রভাবিত হয়েছিলেন সেটা নির্দ্বিধায় বলা যায়। প্রেয়সীর স্মৃতি চিরস্মরণীয় করে রাখতে তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন এমন এক সমাধি নির্মাণ করার যা দুনিয়ার মানুষ আগে কখনও দেখেনি, যা নির্মাণ করার দুঃসাহস দেখাতে যুগের সবচেয়ে ক্ষমতাবান মানুষটিও ভয় পাবে। দুনিয়ার সকল মহলের ‘তাজ’ বা মুকুট হবে যে মহল, মুমতাজ মহলের স্মরণে সেই তাজমহল নির্মাণের মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করলেন শাহজাহান।